শুক্রবার, ২৩ এপ্রিল ২০২১, ০২:২৭ পূর্বাহ্ন

নোটিশ :
Welcome To Our Website...
আশুরার ইতিহাস, গুরুত্ব ও মুসলিমদের করণীয়

আশুরার ইতিহাস, গুরুত্ব ও মুসলিমদের করণীয়

মুসলিমদের ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে প্রচলিত একটি বিশ্বাস হচ্ছে, আরবি বর্ষের প্রথম মাস অর্থাৎ মহররম মাসের ১০ তারিখ দিনটিতে পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। এবং এই দিনেই পৃথিবী ধ্বংস হবে। যেটিকে মুসলমানরা কেয়ামতের দিন বলে বিশ্বাস করেন। যে দিনটি আশুরা হিসেবে পরিচিত।

ইসলামের ভেতর দুটি মত সুন্নি এবং শিয়া উভয়ের কাছেই আশুরার দিনটি সমান গুরুত্বপূর্ণ। সুন্নি মতানুযায়ী ইহুদিরা মুছা আ. এর বিজয়ের স্মরণে আশুরার সওম পালন করতো। তবে শিয়া মত এ ইতিহাসকে প্রত্যাখ্যান করে। শিয়ারা আশুরাকে কারবালার বিষাদময় ঘটনার স্মরণে পালন করে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়া মুসলিমরা এই দিনটিকে নানা আয়োজন আর আনুষ্ঠানিকতায় পালন করে থাকেন। এ উপলক্ষে তারা বিভিন্ন ধরনের মিছিল, মাতম ও শোকানুষ্ঠান করেন।

ইসলামি বর্ষপঞ্জিতে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ চারটি মাসের মধ্যে মুসলিমদের দৃষ্টিতে মহররম অন্যতম। ১০ই মহররম দিনটিকে ‘বিশেষ মর্যাদার’ দৃষ্টিতে দেখে মুসলিমরা।

আশুরা মূলত একটি শোকাবহ দিন। কেননা এদিন নবী মুহাম্মদ-এর দৌহিত্র হুসাইন ইবনে আলী নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন। কিন্তু ইসলামের ইতিহাসে এই দিনটি বিভিন্ন কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বলা হয়, এই দিনে আসমান ও যমিন সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে পৃথিবীর প্রথম মানুষ আদম-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই দিনে আল্লাহ নবীদেরকে স্ব স্ব শত্রুর হাত থেকে আশ্রয় প্রদান করেছেন।

এই দিন নবী মুসা-এর শত্রু ফেরাউনকে নীল নদে ডুবিয়ে দেয়া হয়। নূহ-এর কিস্তি ঝড়ের কবল হতে রক্ষা পেয়েছিলো এবং তিনি জুডি পর্বতশৃংগে নোঙ্গর ফেলেছিলেন। এই দিনে দাউদ-এর তাওবা কবুল হয়েছিলো, নমরূদের অগ্নিকুণ্ড থেকে ইব্রাহীম উদ্ধার পেয়েছিলেন; আইয়ুব দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মুক্ত ও সুস্থতা লাভ করেছিলেন; এদিনে আল্লাহ তা’আলা ঈসা-কে ঊর্ধ্বাকাশে উঠিয়ে নিয়েছেন। প্রচলিত আছে যে এই তারিখেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।

শুধু পৃথিবী সৃষ্টি কিংবা ধ্বংসই নয়- যারা নবী এবং রসুল বলে পরিচিত তাদের জীবনে এই দিনটিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে বলে মুসলিমরা বিশ্বাস করেন। সুন্নি মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ১০ মহররম ইসলামের নবী এবং পয়গম্বরদের কেন্দ্র করে নানা ঘটনা ঘটেছে। সেগুলোর স্মরণ করেই নবী মোহাম্মদের সময়কাল থেকে এ দিনটি পালন করা হতো। পরবর্তীতে এর সাথে যুক্ত হয়েছে কারবালার ঘটনা।

৬৮০ সালে এই দিনে বর্তমান ইরাকের কারবালা নামক স্থানে ইসলামের নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হোসাইন ইবনে আলীকে, যিনি ইমাম হোসাইন নামে পরিচিত, প্রতিপক্ষ নির্মমভাবে হত্যা করে। কারবালার সেই ট্রাজেডিময় ঘটনাটিও যুক্ত হয় আশুরা পালন করার ক্ষেত্রে। বিশেষ করে শিয়া মতাবলম্বীদের পাশাপাশি সুন্নিদের কাছেও এ ঘটনা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

হিজরি ৬১ সনের এই দিনে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করতে গিয়ে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হোসাইন (রা.) এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা কারবালার ময়দানে ইয়াজিদের সৈন্যদের হাতে শহীদ হন। শান্তি ও সম্প্রীতির ধর্ম ইসলামের মহান আদর্শকে সমুন্নত রাখতে হজরত ইমাম হোসাইনের (রা.) আত্মত্যাগ মানবতার ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে। কারবালার শোকাবহ ঘটনা অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে এবং সত্য ও সুন্দরের পথে চলতে প্রেরণা জোগায়।

মুসলিমদের অনেকেই আশুরারা দিন রোজা রাখেন। অনেকে আশুরার আগের দিন এবং পরেরদিনও রোজা পালন করেন। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, রমজান মাস চালুর আগে আশুরার দিন রোজা পালন করা বাধ্যতামূলক ছিল। সুন্নি মুসলিমদের অনেকেই ১০ মহররম বাড়িতে ভালো খাবারের আয়োজন করেন। বিশেষত বাংলাদেশে এই রীতি চালু আছে। তবে এর কোনও বাধ্যবাধকতা নেই বলে ইসলামের ইতিহাসবেত্তরা মনে করেন।

আশুরার দিনটিতে কারবালার প্রান্তরে ইসলামের নবী মোহাম্মদের পরিবারের যেসব সদস্য মারা গেছেন তাদের জন্য দোয়া পাঠ করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করেন। এ কারণে এই দিনে সুন্নি ও শিয়া মতাবলম্বীরা বাড়তি নামাজ আদায় করেন। কারবালার স্মরণে শোককে নিজের মধ্যে ধারণ করেন।

আশুরার দিনটিতে শিয়া মুসলিমদের মাঝে শোকের মাতম চলে। কারবালার প্রান্তরে নবী মোহাম্মদের দৌহিত্র হোসাইনকে হত্যার সময় যে তিনি যে কষ্ট পেয়েছিলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়া মতাবলম্বীরা আশুরার দিনে নিজেরে শরীরে ছুরি মেরে সেই কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশেও রাজধানী ঢাকা সহ বিভিন্ন শহরে তাজিয়া মিছিল বের করা হয়। তাজিয়া মিছিলে প্রচুর সুন্নিও অংশ নেয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে আশুরার রোজা ফরজ ছিলো। দ্বিতীয় হিজরি সনে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার বিধান নাজিল হলে আশুরার রোজা ঐচ্ছিক হিসেবে বিবেচিত হয়। আশুরা দিবসে রোজা পালনের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বাধিক উত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। আর ফরজের পরে সর্বাধিক উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ।’ (মুসলিম: ১/৩৫৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রোজা নিজে পালন করেছেন। উম্মতকে রাখার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাই এর পূর্ণ অনুসরণ ও আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত রয়েছে উম্মতের কল্যাণ। আবু কাতাদা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.)-কে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘এই রোজা বিগত বছরের গুনাহ মুছে দেয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)

আরও বর্ণিত আছে, ‘আশুরা দিনের রোজা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেছিলেন, এর ফলে আগের বছরের গোনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’ (মুসলিম: ১/৩৫৮)

আয়েশা (রা.) বলেন, ‘জাহিলি যুগে কুরাইশরা আশুরার দিনে রোজা পালন করতো। রাসুলুল্লাহ (সা.)-ও সে কালে রোজা পালন করতেন। মদিনায় এসেও তিনি রোজা পালন করতেন এবং অন্যদেরও নির্দেশ দিলেন। রমজানের রোজার আদেশ নাজিল হলে আশুরা দিবস বর্জন করা হয়। এখন কেউ চাইলে তা পালন করুক, আর চাইলে তা বর্জন করুক।’ (বুখারি: ১/২৬৮) আয়েশা (রা.) আরও বলেন, ‘রাসুল (সা.) বলেন, রমজান মাসের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা আল্লাহর মাস মহররমের আশুরার রোজা।’ (সুনানে কুবরা: ৪২১০)

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ

September 2019
M T W T F S S
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
24252627282930
31  

Weather

booked.net




© All Rights Reserved – 2019-2021
Design BY positiveit.us
usbdnews24