মঙ্গলবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১, ০২:৪২ অপরাহ্ন

নোটিশ :
Welcome To Our Website...
আজকের সংবাদ শিরোনাম :
যে দোয়ায় দিনরাত সব সময় সওয়াব মিলে যুক্তরাজ্য জাসদের উদ্যোগে আলোচনা ও মতবিনিময় সভা বৃটেনে ইসলামী শিক্ষা বিস্তার ও মসজিদ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় মাওলানা তহুর উদ্দীন গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করে গেছেন বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু কামনায় যুক্তরাজ্যের বিএনপির খতমে কোরআন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল বালাগঞ্জে কৃষি প্রণোদনা পেয়ে উপকৃত হচ্ছেন কৃষকরা কানাডায় বাংলাদেশি মালিকানাধীন সিকিউরিটি কোম্পানির যাত্রা শুরু ‘শুভ চঞ্চল সকাল’ ‘ঈর্ষান্বিত বিএনপি অপশক্তিকে নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে’ ‘একটাই দাবি- দেশনেত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে হবে’ বিশ্রামে কোহলি, নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টে ভারতের সম্ভাব্য একাদশ

এইসব দিনকাল

হ‌ুমায়ূন আহমেদ

 

বাঘ ও ছাগলের ওই গল্পটা আপনারা নিশ্চয়ই জানেন।

 

এক ছাগল তৃষ্ণার্ত হয়ে নদীর দিকে গেছে। বাঘ তা দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেল। তার মূল পরিকল্পনা ছাগলটাকে খেয়ে ফেলা। এটা সে সরাসরি করতে পারছে না। চক্ষুলজ্জায় পড়েছে। কাজেই সে বলল, ‘এই বেটা, তুই পানি নোংরা করছিস কেন?’ ছাগল ভয়ার্ত গলায় বলল, ‘জনাব, আমি তো পানি নোংরা করছি না। পানি খাচ্ছি।’ বাঘ হুংকার দিয়ে উঠল, ‘আবার মুখে মুখে কথা। হারামজাদা বেয়াদব!’ এই বলেই বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ল ছাগলের ওপর।

 

গল্পটি বললাম, কারণ, আমরা এখন ক্রমাগত ছাগলের ওপর ঝাঁপ দিচ্ছি এবং ঝাঁপ দেওয়ার আগে যুক্তি দাঁড় করাচ্ছি। কারণ, আমরা যুক্তিবাদী প্রাণী। যুক্তি ছাড়া কিছুই করি না।

 

স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় শিক্ষকদের এক অংশ নকল সাপ্লাইয়ে নেমে পড়েছেন। অঙ্ক কষে দিচ্ছেন, বইয়ের কোন অংশ লিখতে হবে দেখিয়ে দিচ্ছেন, এক ছাত্রের কাছ থেকে নকল এনে অন্য ছাত্রকে দিচ্ছেন। এই সব কাজ করছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। তাঁদেরও যুক্তি আছে। তাঁরা বলছেন, শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের সাহায্য করা তাঁদের কর্তব্য। তাঁরা কর্তব্য পালন করছেন। একজন তো আমাকে খুব জোরের সঙ্গে বললেন, ‘এরা গ্রামের স্কুলের ছেলেপুলে, শহরের ছাত্রদের সঙ্গে কম্পিটিশনে পারবে না। একটু–আধটু সাহায্য তো করতেই হবে।’ আমি বললাম, ‘এই যে অন্যায়টা করছেন, আপনার খারাপ লাগছে না?’

 

: অন্যায়? এটাকে অন্যায় বলছেন কেন? তা ছাড়া সবাই তো অন্যায় করছে। করছে না?

যুক্তিটা হচ্ছে সবাই যখন অন্যায় করছে, তিনিও করতে পারেন। ন্যায়–অন্যায়ের সীমারেখা তাঁর কাছে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। যতীন বাবু নামে একজন অঙ্ক শিক্ষকের সঙ্গে ছোটবেলায় আমার পরিচয় ছিল। তিনি আমার ছোট ভাইকে অঙ্ক শেখাতেন। বিপ্লবী না হয়েও তিনি বাঘা যতীন নামে প্রসিদ্ধি লাভ করলেন কঠিন শিক্ষক হিসেবে। পরীক্ষার হলে তিনি উপস্থিত থাকলে কারও সাধ্য নেই এদিক–ওদিক তাকায়, নকল তো অনেক দূরের কথা। এই তিনিই কিন্তু ছাত্রীদের ব্যাপারে কিচ্ছু বলতেন না। মেয়েরা কোলের ওপর বই রেখে টুকলিফাইং করতে থাকলেও তিনি নির্বিকার। তাঁর যুক্তি হচ্ছে, পরীক্ষার জন্য মেয়েগুলোর বিয়ে আটকে থাকে। যেভাবে পারে, পাস করে বেরিয়ে যাক।

 

তাঁর হৃদয়ের মহত্ত্ব নিয়েও কারও মনে কোনো সন্দেহ ছিল না।

যতীন বাবু মেয়েদের প্রতি মমতা দেখিয়ে তাদের পাস করে যাওয়ার সুযোগ দিচ্ছেন। আমরা তাঁর প্রশংসা করছি। এই যতীন বাবুই যদি তাঁর মমতার ক্ষেত্রটি আরও প্রসারিত করতেন এবং ছেলেমেয়ে সবাইকে পাস করবার সুযোগ দিতেন, তাহলে আমরা কি তাঁকে অন্য সব নকল সরবরাহকারীদের সঙ্গে এক করে দিতাম না? যতীন বাবুর মমতা কি অন্যায় করার একটি যুক্তি নয়? আসলে আমরা বোধ হয় ন্যায়–অন্যায় আলাদা করতে পারছি না। সবই জট পাকিয়ে যাচ্ছে। এই কঠিন জট খোলার চেষ্টাও হচ্ছে না। ব্রিটিশ আমলে পুলিশদের ঘুষ খাওয়ার ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে গেল যে পরবর্তী সময়ে পুলিশদের ব্যাপারে ঘুষ নেওয়াটাকে আমরা স্বাভাবিক ধরে নিলাম। অবস্থা যা দাঁড়াচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে শিক্ষকদের নকল সরবরাহের ব্যাপারটাও স্বাভাবিক হয়ে যাবে। আমরা বলব যে একজন টিচার, সে নকল সাপ্লাই করবে না তো কে করবে?

কদিন আগে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহে যাচ্ছিলাম। আমার সঙ্গে নরওয়ের এক ভদ্রলোক। হাইওয়ে দিয়ে যাচ্ছি। নরওয়ের এই ভদ্রলোক চারপাশের সবুজের খেলা দেখে মুগ্ধ ও বিস্মিত। তাঁর জন্য এর চেয়ে বড় বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ভালুকায় একটি স্কুলের কাছে তিনি বিশাল এক জনতা দেখলেন। ভাবভঙ্গিতে মনে হচ্ছে এই জনতা স্কুল আক্রমণ করছে। একদল পুলিশ ও আনসার সেই আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করছে। ভদ্রলোক আঁতকে উঠে বললেন, ‘কী হচ্ছে?’

 

আমি উদাস গলায় বললাম, ‘তেমন কিছু হচ্ছে না। স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা হচ্ছে।’

: পুলিশের সঙ্গে কারা মারামারি করছে?

: ছাত্রদের অভিভাবকেরা।

: কেন?

: ওরাও পরীক্ষার হলে ঢুকতে চায়।

: কেন?

আমি জবাব দিলাম না। ঘুমিয়ে পড়েছি এ রকম একটা ভান করলাম। এর কী জবাব দেব? পরীক্ষা মানেই তো ১৪৪ ধারা, পুলিশ, আনসার, বিডিআর (এখন বিজিবি), লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, ফাঁকা গুলি এবং শেষটায় সত্যিকারের গুলি।

 

অদূর ভবিষ্যতে কী হবে? পরীক্ষার হলের চারপাশে বাংকার তৈরি হবে, সৈনিকেরা এলএমজি নিয়ে চারপাশে বসবেন। কিছুক্ষণ পরপর দূরবর্তী স্থানগুলোতে মর্টার গোলাবর্ষণ করা হবে।

অবস্থাটা এ রকম হলো কেন? যাকেই প্রশ্ন করি, তিনিই ঠোঁট উল্টে বলেন, ‘আর্থ-সামাজিক কারণে।’ এটা বর্তমানে একটা খুব চালু বাক্য। সবাই বলছেন।

আমি ওই দিকে যেতে চাই না। মূল কারণ হিসেবে আমি অভিভাবকদের চিহ্নিত করতে চাই। অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়–অন্যায় বোধ তৈরি করতে পারেননি বা তৈরি করতে চেষ্টা করেননি। তাঁরা চান, যেকোনো ভাবেই হোক তাঁদের ছেলেপুলেদের রেজাল্টটা যেন ভালো হয়। আমি অনেককেই দেখেছি, পরীক্ষার আগে তাঁরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের গ্রামের স্কুল–কলেজে ভর্তি করিয়ে দেন, যেখানে সুযোগ–সুবিধা বেশি।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ

Weather

booked.net




© All Rights Reserved – 2019-2021
Design BY positiveit.us
usbdnews24