রবিবার, ০১ অগাস্ট ২০২১, ০৭:৫৩ অপরাহ্ন

নোটিশ :
Welcome To Our Website...
আজকের সংবাদ শিরোনাম :
সিলেটে রেকর্ড শনাক্তের দিনে ৯ জনের মৃত্যু প্রয়োজনে সাকিব-মিঠুনকে দিয়ে ওপেন করাবেন ডমিঙ্গো! নুসরাতকে ছেড়ে মধুমিতার কাছে যশ! পরিশ্রমের সময় বুকে ব্যথা কেন হয়, করণীয় আগস্টের প্রথম প্রহরে স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগের মোমবাতি প্রজ্বলন বাবা হচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন তালেবানকে শায়েস্তা করতে বি-৫২ বোমারু বিমান পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র কাল থেকে ঢাকায় অক্সফোর্ড–অ্যাস্ট্রাজেনেকার দ্বিতীয় ডোজ টিকাদান শুরু বঙ্গবন্ধুর খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতায় সবচেয়ে এগিয়ে খালেদা জিয়া : প্রধানমন্ত্রী ৪১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল প্রকাশ, উত্তীর্ণ ২১ হাজার ৫৬ জন
টাইগারদের জন্য ভিনদেশিদের ভালোবাসা

টাইগারদের জন্য ভিনদেশিদের ভালোবাসা

 

সম্প্রতি শেষ হয়ে গেলো ক্রিকেট বিশ্বকাপের এবারের আসর। আমি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়ে অনেক বেশি গর্ব অনুভব করি। সত্যি কথা বলতে বর্তমান বিশ্বে বাংলাদেশের অন্যতম পরিচয় বাংলদেশের ক্রিকেট।

 

বিদেশে যখন কারো সঙ্গে নতুন পরিচয় হয় তিনি যদি ক্রীড়ামোদী হন তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বলে বসে তোমাদের দেশ ক্রিকেট খেলে। আর বর্তমান বিশ্বে খেলাধুলার খোঁজ-খবর রাখে না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। অস্ট্রেলিয়া আসার পর থেকেই বহুবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। প্রথম বা সামান্য পরিচয়ের পর আমরা ক্রিকেট নিয়ে ঘণ্টারর পর ঘণ্টা আড্ডা দিয়ে যাচ্ছি।

 

বাংলাদেশে জন্ম নেয়নি কিন্তু বাংলাদেশ ক্রিকেটকে অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসে এমনই কিছু মানুষের গল্প আজ বলবো আপনাদের।

 

মিকের পুরো নাম মাইকেল মিকেলপ। মিকের সঙ্গে পরিচয় আমার বর্তমান কর্মস্থলে যোগ দেয়ার প্রথম দিন থেকেই। অস্ট্রেলিয়াতে কোন অফিসে নতুন কেউ কাজে যোগদান করলে তাকে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়ার রেওয়াজ আছে। তখন সবার সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি সামান্য কথাবার্তাও হয়। সেই সূত্রেই মিকের সঙ্গে পরিচয়ের সময় জানতে পারলাম সে আয়ারল্যান্ডের বাসিন্দা।

 

আমাকেও জিজ্ঞেস করাতে আমি বললাম আমার নাম আলী। ইয়াকুব বললে ওদের উচ্চারণে সমস্যা হবে, তাই আলী নাম দিয়েই চালিয়ে দিলাম। আর আমার আগের অফিসেও আমাকে সবাই আলী বলেই চিনতো। তাই আর নতুন কর্মক্ষেত্রে এসে বদলায়নি। আমি বললাম আমাদের দেশ বাংলাদেশ। আমাদের অফিসে সবাই মোটামুটি আয়ারল্যান্ড ও স্কটল্যান্ডের মানুষ। এর বাইরে কয়েকজন লেবানিজ আছেন আর একজন মাত্র আছে চীনা বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান। সেদিক দিয়ে বিচার করলে আমিই প্রথম মানুষ যার বাড়ি দক্ষিণ উপমহাদেশে অবস্থিত।

 

মিকের সঙ্গে পরিচয়ের পর দুপুরের খাবারের বিরতিতে আবারো আলাপ হলো। অফিসে দুপুরের খাবারের বিরতিতে রান্নাঘরে বসে খাবার সময় সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপের রেওয়াজ আছে। মিক জানতে চাইলো তুমি বাংলাদেশের কোন অংশে বসবাস করতে। আমি বললাম আমার জন্ম পল্লী অঞ্চলে হলেও আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই রাজধানী ঢাকাতে বড় হয়েছি। আমার চাকুরিও ছিলো সেখানেই, তাই বলতে পারো আমি ঢাকাতেই ছিলাম।

 

আমার উত্তরে শুনে দ্রুতই মোবাইলে গুগুল করে ঢাকার রাস্তার জ্যামের ছবি বের করে আমাকে দেখিয়ে বলল, ঢাকাতে তো দেখি অনেক গাড়িঘোড়া। আমি বললাম হ্যাঁ, আর ট্রাফিক জ্যামও অনেক বেশি। দিনের একটা বড় অংশ আমাদের নষ্ট হয়ে যায় রাস্তায়। তবে জ্যামেরও কিছু উপকারিতা আছে। মিক উৎসাহী হয়ে জিজ্ঞেস করলো, যেমন?

 

আমি বললাম, গরীব মানুষেরা তখন ফেরি করে বিভিন্ন রকমের পণ্য বিক্রি করে।

 

 

নিউজিল্যান্ডের শেন ম্যাথিউ এবং লেখক

 

আমি বলেই চললাম। এই যে গরীব মানুষগুলো ফেরি করে বিভিন্ন রকমের পণ্য বিক্রি করে তারা মোটেও কিন্তু স্বচ্ছল নয়। তবে এতে তাদের সুখের কোন কমতি নেয়। তুমি কোন কিছু কিনলেও ভালো না কিনলেও ভালো। তুমি যদি শুধু একটু মুচকি হেসে ওদের সঙ্গে কথা বলো তাহলে দেখবে তারা তাদের হাড় জিরজিরে শরীর নিয়ে তোমাকে এমন একটা হাসি উপহার দিবে যেটা তুমি জীবনেও ভুলবে না।

আমার কথা শুনে আবারও গুগুল করে ঢাকার রাস্তার ভ্রামমাণ ফেরিওয়ালা এক কিশোরীর ছবি বের করে আমাকে দেখালো। সে একটা গাড়ির জানালার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক তোড়া টকটকে লাল গোলাপ আর মুখে এক চিলতে অপার্থিব হাসি। মিক কিশোরীর হাসিমাখা মুখ দেখে অভিভূত হয়ে গেলো। আমি বললাম আমরাই মনে হয় পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র জাতি যারা দারিদ্র এবং দুর্নীতিতে অনেক নিচে অবস্থান করেও সুখী দেশের তালিকায় অনেক উপরে অবস্থানা করে নিয়েছি। এর কারণ বাংলাদেশের এই সাধারণ মানুষগুলোর চাহিদা আসলেই অনেক সীমিত। আমার কথা ও বর্ণনা শুনে মিক তখনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো সে অবশ্যই একসময় বাংলাদেশ ভ্রমণে যাবে।

 

প্রায় প্রতিদিনই আমাদের কোন না কোন কিছু নিয়ে আলাপ হয়। সেখানে বাংলাদেশের ইতিহাস ঐতহ্য থেকে শুরু করে আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস ঐতিহ্যও স্থান পায়। আমি সংক্ষেপে বাংলাদেশের ইতিহাস বললাম। মিকও আয়াল্যান্ডের ইতিহাস সংক্ষেপে বললো। আমি বললাম, ইংরেজরা ভারতবর্ষে গিয়েছিলো বাণিজ্য করতে। তারপর একসময় তারা সেখানকার শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং প্রায় দুশো বছর শোষণ করে।

 

আর ভারতবর্ষ ছেড়ে আসার সময় সবচেয়ে খারাপ কাজটা করে আসে। ভারতের প্রধান দুই ধর্মালম্বী হিন্দু এবং মুসলমানদের ভিত্তিতে দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করে দিয়ে আসে। অবশ্য সেখানে স্থানীয়দেরও ইন্ধন ছিলো। এছাড়া মানচিত্রগুলোও অনেক অদ্ভুত আকারের। একটা দেশের পেটের মধ্যে অন্য একটা দেশের অংশ রয়ে গেছে পূর্বের রাজার বা রাজ্যের অনুসারী বলে, এগুলোকে আমরা বলি ছিটমহল।

 

আমার কথা শুনে মিক বলল, একই কারণে আয়ারল্যান্ডের মানুষরাও ইংরেজদের অপছন্দ করে। তারা আমাদেরকেও প্রায় দুশো বছর শোষণ করেছে এবং অনেক রক্ত ঝরিয়েছে। আর যখনই কেউ একটু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে তখন তাকে ধরে বন্দি করেছে বা বন্দি হিসেবে অস্ট্রেলিয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছে। সেটার প্রতিবাদ হিসেবে আয়ারল্যান্ডের বেশিরভাগ মেয়েশিশুর নাম একসময় রাখা হতো ‘সির্সা’ যার ইংরেজি অর্থ হচ্ছে ‘স্বাধীনতা’।

 

একদিন মিক আমাকে একটা লিংক মেইল করে বলল, তুমি যেহেতু ইতিহাস নিয়ে পড়তে ভালোবাসো এখানে অনেক তথ্য পাবে আয়ারল্যান্ডের ইতিহাস নিয়ে। আমি সেটা পরে মিককে বললাম, আসলেই তোমাদের ইতিহাসও অনেক বেশি মর্মান্তিক ও হৃদয়স্পর্শী। এরপর আমি নিজেই একদিন রোর বাংলার পাতায় আয়ারল্যান্ডের ইতিহাসের একটা সামগ্রিক চিত্র নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়লাম এবং মিকের সঙ্গে আলাপ করলাম। এভাবেই আমাদের বন্ধুত্ব দিনেদিনে অনেক মাত্রা পেয়েছে।

 

ক্রিকেট বিশ্বকাপের শুরু থেকেই আমাদের মধ্যে অনেক আলোচনা হচ্ছে। আমাদের আরেক সহকর্মী শেন ম্যাথিউ যাকে আমরা শোনি বলে ডাকি, নিয়মিত ক্রিকেট খেলা দেখেন। শোনি নিউজিল্যান্ডের নাগরিক। শোনিকে বললাম, আমি দুটো দলের ক্রিকেট খেলার প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। একটা হচ্ছে নিউজিল্যান্ড অন্যটা হচ্ছে দক্ষিণ আফ্রিকা। এই দুটো দলই আসলে ক্রিকেটের মূল্যবোধটা ধারণ করে যে ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা।

 

শুনে শোনি আমার অস্ট্রেলিয় রিপোর্টিং বসকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে, আর বলো না অজিদের স্লেজিংয়ের জ্বালায় ক্রিকেট তার সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। আমিও তাল দিয়ে বলি একদম ঠিক। এভাবেই হাসি ঠাট্টাতে আমাদের ক্রিকেট খেলা নিয়ে নিয়মিত আনন্দ আড্ডা বসে।

 

কথা প্রসঙ্গে শোনি মিককে জিজ্ঞেস করলো, তোমাদের দলতো ক্রিকেট ওর্য়াল্ডকাপে কোয়ালিফাই করতে পারেনি বড় দলগুলোর নোংরা রাজনীতির কারণে। তুমি কোন দোল সাপোর্ট করবে? শুনে মিক নির্দ্বিধায় উত্তর দিলো, আমি বাংলাদেশকে সাপোর্ট করছি এবার। শুনে আমার বুকটা গর্বে ভরে গেলো। ইতোমধ্যে মিক আমার কাছ থেকে বাংলাদেশ দল, অধিনায়ক, অলরাউন্ডার, বোলার সবার খবর জেনেছে। তবে সে সবচেয়ে মজা পেয়েছে রুবেলের ঘটনায়। যখন জানলো রুবেলের প্রাক্তন প্রেমিকার নাম ‘হ্যাপি’। আমি যোগ করে বলেছিলাম, আমাকে একজন বলেছিলো আমি না কি ক্রিকেটার রুবেলের মতো দেখতে। শুনে মিক আমার দিকে তির্যক দৃষ্টি দিয়ে বলল, তাহলে এই ছিলো তোমার মনে। বিয়ের আগের প্রাক্তন প্রেমিকাকে ছেড়ে দিয়েছো। বলেই আমরা দুজন হেসে কুটিকুটি। শোনিও আমাদের সাথে যোগ দিয়ে বলল, ব্যাপার না আলী, এটা হতেই পারে। তখন আবারো হাসির রোল পরে গেলো।

 

এরপর আমি বাংলাদেশ থেকে জার্সি নিয়ে আসলাম শ্যালক প্রীতম আর অগ্নি আপুর মাধ্যমে। শ্যালক প্রীতম কিনে অগ্নি আপুর বারিধারার বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলো। আর অগ্নি আপু দেশ থেকে নিয়ে এসে সাউথ অস্ট্রেলিয়া থেকে আমাদের অফিসের ঠিকানায় কুরিয়ার করে দিয়েছে। যেদিন জার্সি আসলো মিক সেগুলো হাতে নিয়ে বলল, আমার সাইজ হবে না। তখন মনে হলো আসলেই তো আমি মিককে একটা জার্সি কিনে দিতেই পারতাম। আমি বললাম ভেবো না আমি জোগাড় করতেছি একটা তোমার জন্য। শুনে মিক বলল, আরে নাহ, আমি তোমারটা পরেই একটা পোজ দিয়ে দেবো। তুমি ছবি তুলে রেখো। আমি বললাম ঠিক আছে তাই সই। এরপর মিক আমার জার্সিটা পরে ভিক্টরি সাইন দেখিয়ে একটা ছবি তুলে ফেললো।

 

 

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ

Weather

booked.net




© All Rights Reserved – 2019-2021
Design BY positiveit.us
usbdnews24